Type Here to Get Search Results !

Top adds

সাহিত্য ও চলচ্চিত্র

 

সাহিত্য ও চলচ্চিত্র





ফিল্ম বা সিনেমা বাংলা চলচ্চিত্র বা ছায়াছবি। শিল্পের সবচেয়ে বড় মাধ্যমের নাম চলচ্চিত্র। আর চলচ্চিত্রের মূল হাতিয়ার হচ্ছে গল্প। বইয়ের পাতা বা উপন্যানের পৃষ্ঠা থেকে লিখিত সাহিত্য পর্দায় দৃশ্যমান রূপ চলচ্চিত্র। সারা পৃথিবী জুড়ে সাহিত্যনির্ভর গল্পে চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রচলিত রীতি। আর এসব চলচ্চিত্র দর্শক জনপ্রিয় ও ব্যবসাসফল হয়। আমাদের দেশেও একসময় সাহিত্যনির্ভর প্রচুর চলচ্চিত্র নির্মাণ হলেও এখন তেমন হয় না। যার প্রধান কারণ ভালো প্রযোজক বা পরিবেশক ও নির্মাতার অভাব। সেসময় যারা কাজ করতেন তারা প্রচুর পড়াশোনা ও কাজের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বিদ্যমান ছিলেন। এখন অনেকে কাজ করতে আসেন যারা শিল্প সাহিত্যজ্ঞানহীন বা বিশেষ উদ্দেশ্য পাওয়ার আশায়।

এদের একাংশ আশপাশ ভূ-খন্ডে থেকে জোড়া তালি বা কপি পেষ্ট গল্পে বয়ানে ব্যস্ত। যার ফলসরূপ দর্শক হলে না যাওয়া এবং হল কমে যাওয়া। দর্শক গতানুগতিক একই ধারা থেকে মুক্তি চায়। ভালো মৌলিক গল্প দেখতে চায়। সাহিত্য ও মৌলিক গল্পের চলচ্চিত্র যাও দুএকটা হচ্ছে তা সুবিধাবাদি সিন্ডিকেটের সাথে পেরে উঠছে না। আর যারা এসব ছবি বানাচ্ছে তারা আর্থিক ক্ষতিকর হওয়ায় আর আসছে না।

অথচ সাহিত্য ও মৌলিক গল্পের মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্র আাবার ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। এক্ষেত্রে সরকার সহ সংশ্লিষ্ট সবার একযোগে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সাহিত্যনির্ভর কিছু সফল চলচ্চিত্রের উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো-

ক. তিতাস একটি নদীর নাম

অদ্বৈত মল্লবর্মনের লেখা বিখ্যাত উপন্যাস 'তিতাস একটি নাীর নাম' এর কাহিনী অবলম্বনে এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছেন ঋতিক ঘটক। ১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় ১৫৯ মিনিটের এই ছবিটি। ব্রাক্ষণবাড়িয়ার তিতাস নদী আর তার আশপাশের মানুষদের, বিশেষ করে জেলেদের জীবনযাত্রা এই ছবির উপজীব্য বিষয়। এতে অভিনয় করেছেন গোলাম মোস্তফা, কবরী চৌধুরী, রোজী সামাদ, প্রবীর মিত্র সহ গুণী শিল্পীরা। এ ছাড়া নির্মাতা নিজেও অভিনয় করেছেন। ছবিটি সুরকার উস্তাদ বাহাদুর খান, চিত্রগ্রাহক বিবী ইসলাম, সম্পাদক বাসীর হুসেন ও প্রযোজক ছিলেন হাবিবুর রহমান। ২০০৭ সালে ব্রিটিশ
ফিল্ম ইন্সটিটিউট বাংলাদেশের সেরা ১০ টি ছবি নিয়ে দুটি তালিকা প্রকাশ করে। যার একটি তালিকা চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মত, আর অন্যটি দর্শকদের মতে। দুটি তালিকাতে 'তিতাস একটি নদীর নাম' চলচ্চিত্রটি প্রথম স্থান অধিকার করে।

খ. সূর্য দীঘল বাড়ী

গ্রন্থকার আাবু ইসহাকের কালজয়ী উপন্যাস 'সূর্য দীঘল বাড়ী' অবলম্বনে এই চলচ্চিএটি যৌথভাবে নির্মাণ করেন মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী। এটি বাংলাদেশের প্রথম সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত পূর্ণদৈঘ্য চলচ্চিত্র। ১৯৭৯ সালে মুক্তি পায় ১৩২ মিনিটের এই ছবিটি। ছবিতে প্রধান চরিএগুলোতে অভিনয় করেছেন ডলি আনোয়ার, রওশন জামিল, জহিরুল হক, আরিফুল হক, কেরামত মাওলা, এটিএম শামসুজ্জামান। সুরকার আলাউদ্দিন আলী, চিএগ্রাহক আনোয়ার
হোসেন, সম্পাদক সাইদুল আনম টুটুল। ১৯৫০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে অবিভক্ত ভারতের বাংলায় ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে 'পঞ্চাশের আকাল' নামে যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিলো, তাতে লক্ষাধিক দরিদ্র মানুষ প্রাণ হারায়। সে সময় কোনমতে যারা শহরের লঙ্গরখানায় আশ্রয় নিয়ে বাঁচতে পেরেছিলো, তাদেরই একজন হচ্ছেন স্বামী পরিত্যক্ত নারী 'জয়গুণ'। সাথে
রয়েছে তার মৃত প্রথম স্বামীর ঘরের ছেলে ও দ্বিতীয় স্বামীর ঘরের মেয়ে। আরো আছে মৃত ভাইয়ের বউ-ছেলে। তারা গ্রামে ফিরে এসে এমন এক খণ্ড জমিতে ঘর তৈরি করে, যা কিনা অপয়া ভিটে বলে পরিচিত। জীবনযুদ্ধ যখন প্রাণপন লড়াই তখন কুদৃষ্টি পরে গ্রামের মোড়ালের। ঠিক সেসময় দ্বিতীয় স্বামীও তাকে আবার ঘরে তুলতে চায়। জয়গুণ কারো প্রস্তাবেই সায় দেয় না। কিন্তু এ দুজনের স্বাক্ষাত ঘটে যাওয়ায় মোড়ল বিষয়টি মানতে না পেরে হত্যা করে তার প্রতিযোগীকে। ঘটনার একমাত্র দর্শক হিসেবে জয়গুণকে মূল্য দিতে হয় অন্যভাবে। সূর্য দীঘল বাড়ী ছবিটি ১৯৮০ সালে
জার্মানিতে ম্যানহেইম চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ করে এবং এটি ৩টি বিভাগে পুরষ্কার লাভ করে। পর্তুগালের দা ফোড চলচ্চিত্র উৎসব (১৯৮০) তে একটি বিভাগে অংশ নিয়ে পুরস্কার লাভ করে। এ ছাড়াও দেশে ৮টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার লাভ করে।

গ. সারেং বৌ

শহীদুল্লাহ কায়সারের লেখা উপন্যাস 'সারেং বৌ' থেকে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন আবদুল্লাহ আল মামুন। ১৯৭৮ সালে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। এতে অভিনয় করেছেন ফারুক, কবরী, গোলাম মোস্তফা, ডলি চৌধুরী। সুরকার আলম খান, চিএগ্রাহক রফিকুল বারী চৌধুরী, সম্পাদক আমিনুল মিন্টু। এই ছবিট সৈয়দ হকের লেখা আবদুল জব্বারের কন্ঠে 'ওরে নীল দরিয়া আমায় দেরে দে ছাড়িয়া' গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। উপকূলীয় এলাকার মানুষের জীবন সংগ্রামের গল্পে নির্মাণ হয় চলচ্চিত্রটি।

ঘ. হাঙর নদীর গ্রেনেড

সেলিনা হোসেনের 'হাঙর নদীর গ্রেনেড' নামক উপন্যাস থেকে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম এটি নির্মাণ করেন। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পায় ১১৩ মিনিট ব্যাপ্তির ছবি 'হাঙর নদীর গ্রেনেড'। ছবিতে অভিনয় করেন সুচরিতা, সোহেল
রানা, অরুনা বিশ্বাস, অন্তরা, ইমরান, দোদুল, আশিক। ছবিটির সুরকার শেখ সাদী খান, চিত্রগ্রাহক জেড এইচ পিন্টু, সম্পাদক সৈয়দ মুরাদ। চলচ্চিএটি আবর্তিত হয় বুড়ি নামের এক মা কে কেন্দ্র করে। যে মুক্তিযোদ্ধা দুই ছেলে কলিম আর সলিমের মৃত্যু হওয়া সত্বেও অন্য দুই মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ বাঁচাতে তার প্রতিবন্ধী ছেলে রইসকে তুলে দেয় পাকিস্থানি হানাদার বাহিনীর হাতে।

ঙ. শ্রাবণ মেঘের দিন

শ্রাবণ মেঘের দিন সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন জনপ্রিয় নির্মাতা ও কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। সিনেমাটি মুক্তি
পায় ১৯৯৯ সালে। তারই লেখা ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়েছে সিনেমাটি। অভিনয় করেছেন জাহিদ হাসান, শাওন, মাহফুজ আহমেদ, আনোয়ারা, ডা. এজাজ সহ অনেকে। মতি নামের একজন যুবককে গ্রামেরই কুসুম নামের এক মেয়ে মনে মনে ভালোবাসে। মতি একজন গায়ক। কুসুমের গলাও বেশ ভালো। ঢাকা থেকে আসা জমিদারের নাতনী শাহানা’কে ভালোবেসে ফেলে মতি। এদিকে কুসুমেরও বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। এমনই এক গল্প বয়ানে এগিয়ে চলে ছবির কাহিনি। ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমাটি মোট ৬টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছিলো।

এ ছাড়াও আলাউদ্দিন আল আজাদের বিখ্যাত উপন্যাস তেইশ নম্বর তৈলচিএ অবলম্বনে সুভাষ দত্ত নির্মাণ করেছেন বসুন্ধরা (১৯৭৭), শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় উপন্যাস দেবদাস অবলম্বনে চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেছেন দেবদাস (১৯৮২), মানিক বন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাস 'পদ্মা নদীর মাঝি' অবলম্বনে গৌতম ঘোষ নির্মাণ করেছেন দুই বাংলার
ছবি 'পদ্মা নদীর মাঝি' (১৯৯০), মুহম্মদ জাফর ইকবালের জনপ্রিয় কিশোর উপন্যাস অবলম্বনে সরকারি অনুদানে
মোরশেদুল ইসলাম নির্মাণ করেছেন শিশুতোষ চলচ্চিত্র 'দীপু নাম্বার টু'(১৯৯৬), সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাস অবলম্বনে তানভীর মোকাম্মল নির্মাণ করেছেন লালসালু (২০০১), চলচ্চিএকার ও সাহিত্যিক আমজাদ হোসেনের মুক্তিযুদ্ধভিওিক উপন্যাস 'অবেলায় অসময়' অবলম্বনে তৌকির আহমেদ নির্মাণ করেছেন জয়যাত্রা (২০০৪), ঔপন্যাসিক ও নির্মাতা জহির রায়হানের উপন্যাস 'হাজার বছর ধরে' অবলম্বনে কোহিনুর আক্তার সুচন্দা নির্মাণ করেছেন 'হাজার বছর ধরে' চলচ্চিত্রটি।

এ ছাড়া আরো অনেক সাহিত্য নির্ভর চলচ্চিত্র রয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্র বিশ্ব দরবারে সুনাম বয়ে আনুক এবং আরোও ভালো সাহিত্য নির্ভর ও মৌলিক গল্পের রুচিশীল চলচ্চিত্র নির্মাণ হোক। 

Tags

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Below Post Ad